আন্তর্জাতিক ডেস্ক: কিয়েভের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে রুশ বাহিনী। এখন একমাত্র লক্ষ্য রাজধানী দখল করা। আর সেই লক্ষ্যেই তারা যুদ্ধটাকে চারপাশে আরো ছড়িয়ে দিয়ে ধাপে ধাপে এগোচ্ছে কেন্দ্রের দিকে। সর্বশেষ খবর, কিয়েভের প্রাণকেন্দ্র থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে মাইলদীর্ঘ রুশ সাঁজোয়া বহর। কিয়েভ জয়ে ঠিক কী ছক অনুসরণ করছে রাশিয়া, তা জানতে জল্পনার অন্ত নেই সমরবিশারদদের। ধীর গতিতে এক-একটি অঞ্চল দখল করতে-করতে এগিয়েছে পুতিনের সেনারা। দখল করা অংশগুলোতে মোতায়েন করেছে ভারী ট্যাঙ্ক ও যুদ্ধাস্ত্র। শহর ছাড়তে ইচ্ছুক নাগরিকদের জন্য মানবিক করিডোর তৈরি করেছে। পাশাপাশি দখলি শহরের নিজেদের অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে নাগরিকদের মন জয়ের চেষ্টায় রাজনৈতিক প্রচার-প্রপাগান্ডাও শুরু করেছে। এমনকি গণভোটেরও আয়োজন করা হচ্ছে কোথাও কোথও।
গতকালও ইউক্রেনের বেশ কয়েকটি শহরে দুপক্ষের মধ্যে সম্মুখ সমরের খবর পাওয়া যায়। স্থানীয় সংবাদ সংস্থাগুলো দাবি, যুদ্ধ এমনই ভয়াবহ চেহারা নিয়েছে যে, রাস্তায়
ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো তুলে নিয়ে গিয়ে কবর দেয়ার মতো লোকও মিলছে না কোথাও! এসবের মধ্যে গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছে, ইউক্রেনকে তারা অতিরিক্ত ২০ কোটি ডলারের অস্ত্র ও সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে। এই খবর প্রকাশ হওয়ার পরই হোয়াইট হাউসের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে ক্রেমলিনও জানিয়ে দেয়, তারা এবার ইউক্রেনমুখী অস্ত্রবাহী মার্কিন কনভয় লক্ষ্য করে হামলা চালাবে। এছাড়া গতকাল সকালে পশ্চিম ইউক্রেনের লিভভ অঞ্চলে অবস্থিত আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী ও নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রুশ বিমানগুলো হামলা চালায় এবং ৮টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এতে কমপক্ষে ৫৭ জনের মৃত্যুর খবর জানান কর্মকর্তারা।
যুদ্ধের আঠারোতম দিনে গতকালও রাশিয়ার বিধ্বংসী রূপ দেখতে হয় ইউক্রেন তথা বিশ্বকে। সব দিক থেকে সাঁড়াশির মতো কিয়েভের টুঁটি চেপে ধরতে এখন মরিয়া তাদের বাহিনী। শহরতলিতে লাগাতার হামলা চলছে। শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে ভেসেলকিভে গতকাল রুশ গোলার আঘাতে আকাশছোঁয়া ধোঁয়ার স্তম্ভ তৈরি হতে দেখা যায়। আর তার কিছুক্ষণ পরই শুরু হয় বিরামহীন বিস্ফোরণ। সূত্রের খবর, ওই অঞ্চলে ইউক্রেনের মজুত থাকা অস্ত্রাগারে রুশ বাহিনীর হামলার ফলে কয়েকশ বিস্ফোরণ ঘটে। পাশাপাশি, খারকিভ, মারিপোল, সুমিসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গোলাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছে রুশ বাহিনী। দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেনের মেলিটোপোল শহরের মেয়রকে রুশ সেনারা অপহরণ করলে প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে শহরের লোকজন। তবে এ মুহূর্তে সব চেয়ে উত্তপ্ত পরিস্থতি রাজধানী কিয়েভ ঘিরে। বাতাসে আতঙ্ক, আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই না কিয়েভের পতন ঘটে যায়!
এই অবস্থার মধ্যেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভøলাদিমির জেলেনস্কি পবিত্রভূমি জেরুজালেমে একটি শান্তি বৈঠক আয়োজনের জন্য ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের শরণাপন্ন হয়েছেন। গত শনিবার সাংবাদিক বৈঠক করে তিনি জানান, রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতা করতে তিনি পুরোপুরি প্রস্তুত। এত দিন বলছিলেন, মস্কো হামলা বন্ধ না করলে তিনি কোনো সমঝোতায় যেতে রাজি নন। গতকাল সে প্রসঙ্গেই যাননি। সাংবাদিকদের জানান, জেরুজালেমে শান্তি বৈঠক আয়োজনের জন্য বেনেটকে অনুরোধ করেছেন তিনি। এবার আর কোনো প্রতিনিধি স্তরে আলোচনা নয়, আমি সরাসরি শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলতে চাই।
এদিকে যুদ্ধের গতি-প্রকৃতির ওপর নজর রাখা বিশ্লেষকরা অনেকেই ভেবেছিলেন, রুশ রাষ্ট্রনায়ক ভøাদিমির পুতিনের হিসাবে সম্ভবত কিঞ্চিৎ ভুল হয়ে গেছে। ইউক্রেনের ক্ষমতার আন্দাজ করতে পারেননি তিনি। ফলে ক্ষুদ্র প্রতিবেশী দেশটিকে দখল করতে গিয়ে বেকায়দায় পড়ে গেছে মস্কো। কিন্তু সমর-বিশেষজ্ঞরা এখন বলছেন, স্তালিনের যুগ থেকে এটাই রাশিয়ার সুবিদিত রণকৌশল। তারা এ ভাবেই একটু একটু করে ভাঙতে থাকে বিপক্ষের শক্তিকে। শত্রæর সেনাবাহিনী যখন ক্লান্ত হয়ে আসে, নিঃশেষ হতে হতে যখন তাদের মনোবলে ভাঙন ধরতে শুরু করে, তখনই তারা শুরু করে আসল যুদ্ধ- ঠিক যা তারা করছে ইউক্রেনে। অতীতে সিরিয়া ও চেচনিয়াতেও ঠিক এটাই ঘটিয়েছিল তারা।
অন্যদিকে রুশ বাহিনীর হাতে অবরুদ্ধ মারিপোল শহরে রীতিমতো মানবিক বিপর্যয় চলছে। যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে পড়া সাধারণ মানুষকে উদ্ধারের কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ। বাইরে থেকে খাবার, পানীয় জলও পাঠানো যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ নেই, ঘর গরম রাখার ব্যবস্থা নেই। মারিপোলের মেয়র জানান, গর্ত খুঁড়ে গণকবর দেওয়ারও উপায় নেই কোনো। সব বন্ধ। এক দিকে চলছে সংঘর্ষ, অন্য দিকে চলছে কর্মকর্তাদের ধরপাকড়। একটি ভিডিয়ো ফুটেজ ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। তাতে দেখা যাচ্ছে, একটি বাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে এক ব্যক্তিকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে রুশ বাহিনী। সেই ‘বন্দি’ ইউক্রেনের মেলিটোপোল শহরের মেয়র। ইউক্রেন প্রশাসনের পক্ষ থেকে টুইট করা হয় ভিডিওটি।
অন্যদিকে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্রো কুলেবা জানান, খেরসন শহরে জনসমর্থন পেতে রাশিয়া সেখানে একটি গণভোটও পরিচালনা করার পরিকল্পনা করছে। উল্লেখ্য খেরসনই হলো ইউক্রেনের প্রথম বড় শহর, যেটির দখল নেয় রাশিয়া। খেরসনের উচ্চপদস্থ এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে খেরসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। এই গণভোট সংগঠিত করতে তাদের সাহায্য চাওয়া হচ্ছে।

Leave a Reply