ওয়েব ডেস্ক: বাইরে ঘন কুয়াশার সঙ্গে হাড়কাঁপানো শীত। বইছে হিমেল বাতাস। তবু থেমে নেই সালমাতের জীবন। গায়ে কোনোমতে পোশাক জড়িয়ে বেরিয়ে পড়লেন শ্রম বেচতে। একদিন না গেলে পাতিল ওঠে না উনুনে, চলে না স্ত্রী-সন্তানদের পেট। এজন্য কনকনে শীতে শরীর কাঁপলেও জীবিকার তাগিদে বের হলেন দৈনিক হাজিরার কাজে।
নির্মাণশ্রমিক সালমাত হোসেনের মতো ইউনূস মিয়ারও একই হাল। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম হওয়ায় তাকেও শীত উপেক্ষা করে কাজে যেতে হয় সাতসকালে। আর শীতের তীব্রতায় বেড়েছে গরম পোশাকের চাহিদা। সুযোগে দামও হাঁকাচ্ছেন বিক্রেতারা। হঠাৎ জেঁকে বসা তীব্র শীত আর পোশাকের বাড়তি দামে বেশ বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষেরা।
টানা কয়েকদিন ধরেই কুয়াশার চাদরে মোড়া রাজধানী ঢাকা। প্রচণ্ড শীতে জবুথবু জনজীবন। বেলা গড়ালেও তেমন দেখা মিলছে না সূর্যের। কুয়াশা আর হিম বাতাসে ভারী কাপড়েও নিবারণ করা যাচ্ছে না শীত। ফলে অনেকটা বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ। পেট চালানোর দায়ে নিরুপায় হয়ে কাজে বের হতে হচ্ছে তাদের।
সালমাতের বাড়ি ময়মনসিংহে হলেও জীবিকার তাগিদে থাকছেন ঢাকায়। দৈনিক ৭০০ টাকা হাজিরায় রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। তবে বেশিরভাগ সময় করেন ঢালাইয়ের কাজ। শনিবারও যথারীতি সময়ে বের হন তিনি। ফুটপাতের পাশে সড়কে রাখা ছিল তাদের মিক্সার মেশিন। এই মেশিন ঠেলেই কাজের গন্তব্যে নেবেন তারা। এজন্য অন্যান্য শ্রমিকদের অপেক্ষা করছিলেন তিনি। তার গায়ে ছিল লাল রঙের হাফহাতা টিশার্ট ও গামছা জড়ানো।
তিনি বলেন, ‘শীত লাগলেও কিছু করার নেই। পেটের ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে বের হতেই হবে। গ্রামে স্ত্রী, ছেলে-মেয়েরা আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। কোনো কারণে একদিন কাজে যেতে না পারলে তাদের মুখে ভাত জুটবে না। এজন্য এই শীতে কষ্ট পেলেও পরিবারের কথা ভেবে সব সহ্য করে নিতে হয়। কেননা গরিবের শীত থাকতে নেই।’
সালমাতের সুরেই কথা বলেন শেরপুরের ইউনূস মিয়া। তিনিও দৈনিক হাজিরায় কাজ করেন। ইউনূস বলেন, ‘আমি একা কাজ করলে পরিবারের সবার পেটে ভাত ঢোকে। নয়তো উপোস থাকলেও কেউ জিজ্ঞেস করে না। আসলে আমাদের শরীরের কাঁপন সবাই দেখতে পায়, কিন্তু গরিবের ক্ষুধার কান্না কারও চোখে পড়ে না। তাই হাড়ভাঙা শীতেও উপার্জনের আশায় আমাদের কাজে বের হতে হয়।’
সপ্তাহ আর মাসিক কিস্তির ঘানি টানতে হয় আরেক দিনমজুর শফিকুলকে। তার বাড়ি কিশোরগঞ্জের কেন্দুয়া উপজেলায়। তবে রাজধানীর কুড়িল এলাকার যমজ রোডের একটি রিকশা গ্যারেজে থাকেন। এখান থেকেই রিকশা ভাড়ায় চালান তিনি। কোনোভাবে রিকশার প্যাডেল না ঘুরলে কিস্তির টাকা জোগাড়ে হিমশিম খেতে হয় তাকে। তাই ভোর হলেই বেরিয়ে পড়েন রিকশা নিয়ে।
রিকশাচালক শফিকুল বলেন, চারটি বড় কিস্তি রয়েছে। দুটো সাপ্তাহিক আর দুটো মাসিক। সবমিলিয়ে মাসে ১৬ হাজার টাকার মতো এখানে দিতে হয়। তবে সংসারের চাপ আমাকে নিতে হয় না, কারণ দুই ছেলে থাকায় তারাই দায়িত্ব নিয়েছে। আমি শুধু কিস্তির বোঝা মাথায় নিয়েছি। যদিও আর কয়েকটি দিলেই এখান থেকে মুক্তি পাব।
ঢাকায় টানা কয়েকদিনের ঠান্ডার প্রভাব পড়েছে ফুটপাতের গরম কাপড়ের দোকানে। শীতের দাপট বেশি থাকায় এসব দোকানে ভিড় জমাচ্ছেন ক্রেতারা। মহাখালী, গুলশান, নতুনবাজার, বাড্ডাসহ রাজধানীর বেশিরভাগ ফুটপাতে দেখা গেছে এমন চিত্র।
গুলশান কালাচাঁদপুর এলাকায় ভ্যানে ছোট-বড় সব ধরনের গরম পোশাক বিক্রি করেন মো. শাওন। তার এখানে মোটা গেঞ্জি, সোয়েটারসহ হরেক রকমের শীতের কাপড় রয়েছে। আকারভেদে ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় মিলছে মোটা গেঞ্জি। তবে শিশুদের জামা রয়েছে বেশি।
শাওন বলেন, ‘দু-চারদিন আগেও জমজমাট বেচাকেনা ছিল। আজ তুলনামূলক কিছুটা কম। এরপরও বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভালোই বিক্রি হয়েছে। আবহাওয়া এমন থাকলে এবারের শীতে ভালো ব্যবসা হবে বলে আশা করছি। কারণ অন্যান্য মৌসুমে ঢাকায় তেমন একটা শীত পড়ে না। ফলে বেশিরভাগ মানুষই নতুন কাপড় কেনেন না।’
মহাখালীর আমতলীতে কথা হয় শুভ হোসেনের সঙ্গে। ভ্যানে করে সোয়েটার বিক্রি করেন তিনি। অনেকটা আক্ষেপ করে শুভ বলেন, ‘এবারের শীতের শুরুতেও ফুটপাতে তেমন ভ্যান ছিল না। কিন্তু হঠাৎ তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় মৌসুমি বিক্রেতারা এখানে এসে বিক্রি করছেন। এতে আমাদের বেচাকেনায় কিছুটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া, এ বছর এমন শীত অনুভূত হবে এটা কেউই কল্পনা করেনি।’
আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত ঢাকাসহ সারাদেশে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। কোথাও কোথাও অব্যাহত থাকতে পারে দুপুর পর্যন্ত। এমনকি শীতের এই অনুভূতি কমার কোনো লক্ষণও নেই। ঢাকায় শনিবার দুপুর পর্যন্ত ছিল কুয়াশায় ঘেরা। দুপুরের দিকে রোদের মুখ দেখা গেলেও ছিল না তেমন তেজ। সবমিলিয়ে পৌষের হাড়কাঁপানো শীতে নাজেহাল জনজীবন।