ওয়েব ডেস্ক: জেন-জি নেতৃত্বাধীন ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ভোটকেন্দ্রের বাইরে ভোটারদের সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
৩০ বছরের কম বয়সী জেন-জিদের নেতৃত্বে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর বিশ্বের প্রথম কোনও দেশ হিসেবে বাংলাদেশে আজকের এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশে স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থার জন্য এবারের নির্বাচনে সুনির্দিষ্ট ফলাফল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শেখ হাসিনাবিরোধী প্রাণঘাতী আন্দোলনে কয়েক মাসের ব্যাপক অস্থিরতায় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন শিল্প খাতের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
রয়টার্স বলেছে, ৩০ বছরের কম বয়সীদের নেতৃত্বে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের পর বিশ্বের প্রথম নির্বাচন বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। একই ধরনের আন্দোলনের মুখে সরকারের পতনের পর আগামী মাসে নেপালেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশের এই নির্বাচনে প্রধান দুই দলের নেতৃত্বাধীন দুটি জোট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন দু’টি জোট। যারা একসময় মিত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। ভোটের আগের বিভিন্ন জনমত জরিপে নির্বাচনে বিএনপিকে এগিয়ে রাখা হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকায় ভোটকেন্দ্র খোলার আগেই স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে ভোটারদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। তাদের মধ্যে ছিলেন ৩৯ বছর বয়সী মোহাম্মদ জোবায়ের হোসেন। তিনি সর্বশেষ ২০০৮ সালে ভোট দিয়েছিলেন বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন।
ভোটার সারিতে দাঁড়িয়ে মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, ‘‘আমি বেশ রোমাঞ্চিত। কারণ ১৭ বছর পর আমরা অবাধে ভোট দিচ্ছি। আমাদের ভোট গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্থ হবে।’’
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ রয়েছে এবং তিনি দীর্ঘদিনের মিত্র দেশ ভারতে নির্বাসনে রয়েছেন। এর ফলে দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে এবং বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সমালোচকরা বলছেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও সেগুলোতে বিরোধী দলের বর্জন ও ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ ছিল।
এবার জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনে ২ হাজারের বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন; তাদের মধ্যে অনেকেই স্বতন্ত্র। একজন প্রার্থী মারা যাওয়ায় একটি আসনে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে অন্তত ৫০টি দল; যা জাতীয় রেকর্ড।
শেখ হাসিনার পতনের পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস চলতি সপ্তাহে বলেছেন, ‘‘এই নির্বাচন কেবল আরেকটি নিয়মিত ভোটে মতো নয়।’’
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বৈষম্য, বঞ্চনা ও অবিচারের বিরুদ্ধে যে গণজাগরণ আমরা দেখেছি, এই নির্বাচন তারই সাংবিধানিক প্রকাশ।
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের ভোটগ্রহণের পাশাপাশি গণভোটও হচ্ছে; যেখানে সংবিধান সংস্কারের একগুচ্ছ প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠা, সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করা, নারীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দু’বারে সীমিত করার কথা বলা হয়েছে।
প্রার্থীসংখ্যা বেশি ও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের প্রত্যাশা থাকলেও নির্বাচনী প্রচারণা মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাও ঘটেছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক থমাস কিয়ান বলেন, ‘‘বর্তমানে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করা এবং এরপর সব পক্ষের ফল মেনে নেওয়াই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। যদি তা হয়, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ যে, বাংলাদেশ সত্যিই গণতান্ত্রিক নবজাগরণের পথে হাঁটছে।’’
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটের দিন সারা দেশে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রের বাইরে পুলিশ ও সেনা সদস্যদের অবস্থান করতে দেখা গেছে।
ভোটগ্রহণ শেষ হবে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে। এরপর শুরু হবে ভোট গণনা। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলেছেন, মধ্যরাতের দিকে প্রাথমিকভাবে ফলাফল পাওয়া যেতে পারে এবং শুক্রবার সকাল নাগাদ ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভোটার তালিকায় নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ; এর মধ্যে ৪৯ শতাংশ নারী। তবে নির্বাচনে নারী প্রার্থী আছেন মাত্র ৮৩ জন। মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে; যাদের অনেকেই প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন।
ঢাকার কাছের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে অস্থায়ী ভোটকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালের দিকে সেখানে বোরকা পরা নারীদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। ৩২ বছর বয়সী গৃহবধূ রুমা খাতুন তার হাতে মেহেদী দিয়ে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের নকশা এঁকেছেন; যা জামায়াতে ইসলামীর প্রতীক।
তিনি বলেন, ‘‘আমি ড. শফিকুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী দেখতে চাই। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতিমুক্ত, উন্নত বাংলাদেশ গড়তে পারবেন।’’
নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী দু’জন রয়েছেন; বিএনপির তারেক রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
তবে অনেক ভোটারই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন। রিকশাচালক চান মিয়ার মতো কেউ কেউ বলেন, ভোট দেওয়ার জন্য গ্রামে যাওয়ার খরচ বহনের সামর্থ্য নেই তাদের। গ্রামে গেলে ঢাকায় দৈনিক আয় হারাবে। আবার দারোয়ান মোহাম্মদ সবুজের মতো কেউ কেউ হতাশ। কারণ শেখ হাসিনার দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
কেউ কেউ ভোট দেওয়ার বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। চালক শাকিল আহমেদ বলেন, হাসিনার সময় আমরা ভোট দিতে পারিনি। ভোট দেওয়া আমার অধিকার। এবার আমি এটা হাতছাড়া করব না।
সূত্র: রয়টার্স।