ওয়েব ডেস্ক: নির্বাচনে শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীগুলোকে তাদের দায়িত্বটা নিষ্ঠার সাথে পালন করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেছেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো যদি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, জনগণ বসে থাকবে না। জনগণ তার দায়িত্ব ঠিকই পালন করবে এবং সুষ্ঠু ভোট আদায় করে ছাড়বে।
কারও আনুকূল্যও চাই না, আবার আমরা অন্য কাউকে আনুকূল্য দেখানো হোক সেটাও দেখতে চাই না উল্লেখ করে জামায়াত আমির আরও বলেছেন, আমরা অতীতের মতো আর কাউকে দেখতে চাই না যে সরকারি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী-কর্মকর্তা হয়ে কেউ নির্দিষ্ট কারো পক্ষ নেবেন। এটা আমরা একেবারেই দেখতে চাচ্ছি না। আমরা চাই সবাই নিরপেক্ষতার সাথে যার যার জায়গা থেকে এ দায়িত্ব পালন করবেন।
আজ (মঙ্গলবার) সন্ধ্যায় ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন জামায়াত আমির।
এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন— জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ জোটের সব দলেরই শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আজকে আমরা জামায়াতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের শীর্ষ দায়িত্বশীলবৃন্দ একসাথে বসেছিলাম। আমরা দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা করেছি। আগামী ১২ তারিখ ইনশাআল্লাহ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। একই দিনে দুটি ভোট। একটি গণভোট, দ্বিতীয়টি হচ্ছে সরকার গঠনের জন্য ভোট। গণভোটে ইতোমধ্যেই আপনারা জানেন যে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। জুলাই আকাঙ্ক্ষার আলোকে যে সংস্কার প্রস্তাব উপস্থাপিত হয়েছে, এটার বৈধতা দেওয়ার জন্য যে গণরায়ের দরকার এর জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে আমাদের অবস্থানের পক্ষে।
তিনি বলেন, আমরা সারাদেশে সর্বত্র আমাদের প্রচারণার শুরু থেকে গণভোটে হ্যাঁ, এই মোটিভেশন নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি এবং আমরা আশাবাদী ইনশআল্লাহ বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হবে।
‘হ্যাঁ’ যদি বিজয়ী হয় তাহলে বাংলাদেশ জিতে যাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ যদি বিজয়ী হয় তাহলে ইনশাআল্লাহ জুলাই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হওয়ার পথ খুলে যাবে। ‘হ্যাঁ’ যদি বিজয়ী হয় তাহলে অতীতের নির্যাতন-নিপীড়নের অবসান ঘটবে এবং তার যৌক্তিক ন্যায়সংগত বিচার হবে। ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে আবরার ফাহাদ থেকে শুরু করে আমাদের বিপ্লবী শরীফ উসমান হাদী পর্যন্ত সকলের বিচারটা তাদের পরিবার পাবে। এই যে ১৪০০ শহীদ যারা জীবন দিয়ে জাতিকে জীবন এনে দিল, তাদের প্রতি আমরা গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।
দল ও জোটের অবস্থান শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল দাবি করে জামায়াত আমির বলেন, আমরা জোটের দলগুলা সবসময় সংস্কারের পক্ষে ছিলাম। আমরা পরিবর্তনের পক্ষে ছিলাম। জাতি অতীতের রাজনীতির ভুক্তভোগী এবং এই জাতির অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। ৫৪ বছরে এই জাতি বহুদূর এগিয়ে যেতে পারতো। দুর্নীতি দুঃশাসনের কারণে জাতি এগুতে পারেনি। আমাদের অঙ্গীকার হচ্ছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থা এবং আমরা সমাজের সুশাসন বা গুড গভর্নেন্স দেখতে চাই। এর সাথে সাথে আমরা সমাজের সর্বত্র ন্যায়বিচার কায়েম করতে চাই। এই দুইটা জিনিস যদি নিশ্চিত করা যায় তাহলে আমাদের সমাজ যেভাবে পশ্চাৎপদ হয়ে পড়ে আছে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ হবে।
যুবকদের আকাঙ্ক্ষা ছিল যে তারা কোনো ভাতা বা কোনো দয়া দেখতে চায় না উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যুবকরা নিজেই এই বাংলাদেশ গড়ার গর্বিত অংশীদার হতে চায়। এ ক্ষেত্রেও আমাদের অবস্থান স্পষ্ট যে, তাদের হাতে ভাতা নয় বরং আমরা তাদের উপযুক্ততা অনুযায়ী কাজ তুলে দিয়ে বলতে চাই যে এবার তোমরাই বাংলাদেশটা গড়ো।
তিনি বলেন, আমরা আসলে তরুণদের হাতেই বাংলাদেশ তুলে দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি৷ পরপর চারটি নির্বাচনে মানুষ তাদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী ভোট দিতে পারেনি। ২০০৮ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে গণরায়ের কোনো প্রতিফলন হয়নি। এবারকার নির্বাচনে আমরা স্পষ্টতই দেখতে পাচ্ছি যে মানুষের মধ্যে এই নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। যাদের ভোট গ্রামে আছে তারা দলে দলে অনেকটা ঈদের উচ্ছ্বাস এবং আনন্দের মতো তারা যাচ্ছে নিজেদের নাড়ির টানে। সেখানে তারা ভোট দিতে চায় এবং তারা তাদের মনের মতো সরকারও দেখতে চায়।
আশাবাদ ব্যক্ত করে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, গণরায় প্রতিফলিত হলে বাংলাদেশ ইনশআল্লাহ নতুন রাজনীতির দিকে আগাবে এবং নতুন বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হবে।
জনগণের সচেতনতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধেই সকল অপতৎপরতার উপযুক্ত জবাব হতে পারে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, আমরা বিশ্বাস করি আমাদের যুবসমাজ ঘুমিয়ে পড়েনি। তাদের অসমাপ্ত দায়িত্ব পালন করার জন্য তারা এই নির্বাচনকে সফল করে তুলবে ইনশআল্লাহ যে কোনো মূল্যের বিনিময়ে।
তিনি বলেন, কেউ অন্য কিছু করতে চাইলে আমরা অনুরোধ করবো, জনগণ যেন নিজের অধিকারের পক্ষে মজবুত হয়ে দাঁড়িয়ে যায় এবং স্পষ্ট জবাব দিয়ে দেয়। আমরা আশা করছি জনতারই বিজয় হবে শেষ পর্যন্ত ইনশাআল্লাহ।
তিনি বলেন, পিছন পথে কেউ এসে কিছু করে সফল হতে পারবে এটা আমরা মনে করি না। নির্বাচন প্রক্রিয়ার সাথে যারা সম্পৃক্ত আছেন— নির্বাচন কমিশন, তারপরে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত এবং যারা নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত, শৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত, তাদের সকলের প্রতি আমাদের অনুরোধ, এ দেশ আপনাদেরও, আপনারা ন্যায়নিষ্ঠভাবে, নিরপেক্ষভাবে সুষ্ঠুভাবে আপনাদের দায়িত্ব পালন করবেন। তাহলে জনগণের ভালোবাসা পাবেন, সমর্থন পাবেন এবং জনগণ আপনাদের এই কাজের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে অবশ্যই আপনাদের মূল্যায়ন করবে।
নির্বাচনের দিনেও বহু ধরনের গুজব ছড়ানো হতে পারে শঙ্কা প্রকাশ করে জামায়াত আমির বলেন, ১১ দলের পক্ষ থেকে আমরা জনগণকে আহ্বান জানাবো, কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য না পাওয়া পর্যন্ত কোনো বিভ্রান্তিমূলক কথায় মোটেই কান দেবেন না। যারা পরাজয়ের ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত, যেকোনো পক্ষ, এই ধরনের কাজ করতে পারে। মিথ্যা অপবাদ ছড়াতে পারে, ভয়ভীতি সৃষ্টির জন্য আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য। কিন্তু না সবকিছুকে জয় করেই ইনশাআল্লাহ আপনারা সেদিন আপনাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন এবং ভোটের রেজাল্ট হাতে না নিয়ে আপনারা কেউ ফিরবেন না। কারণ আপনি ভোট দেওয়ার পরেও আপনার ভোট নয়ছয় হয়ে যেতে পারে। আবার ভোট দেওয়ার আগেও বিভিন্ন ধরনের সমস্যা, কেউ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে পারে। এই সবকিছুকে আমরা বিশ্বাস করি, এই বীর জাতি মোকাবিলা করেই ইনশাআল্লাহ ১২ তারিখের নির্বাচনকে সফল করে তুলবে এবং সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার গঠিত হবে।
তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নতুন সরকার হবে জনআকাঙ্ক্ষার সরকার, এই সরকার হবে কৃষক শ্রমিক, মেহনতি জনতাসহ মাঝি-মজুর সকলের সরকার, সকল শ্রেণিপেশার মানুষের সরকার, নারী-পুরুষের সরকার। এই সরকার কোনো দলের হবে না। এই সরকার কোনো গোষ্ঠীর হবে না। এই সরকার কোনো পরিবারের হবে না, সরকার হবে জনগণের সরকার ইনশাআল্লাহ। আমরা সেই জনগণের বিজয়টার দিকেই মুখিয়ে আছি।
আমরা জাতিকে এই বার্তাই দিচ্ছি, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সর্ব সহযোগিতায় ১১ দল প্রস্তুত।
নির্বাচনের ফলাফল আপনাদের পক্ষে যেতে পারে, আবার বিপক্ষেও যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আপনাদের অবস্থান কী হবে? জানতে চাইলে জামায়াত আমির বলেন, আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। আমরা বললেই এটা সুষ্ঠু হবে না। আর সুষ্ঠু হয়নি বললেও এটা ওইরকম হবে না। যখন জনগণ বলবে যে, এটা সুষ্ঠু হয়েছে, আমরা এটা শ্রদ্ধার সাথে মেনে নেবো। আমরা বিজয়ী হই অথবা আমরা বিরোধী দলে বসি, এটা কোনো ম্যাটার করে না। আমরা আমাদের জনগণের ওপর খুবই আস্থা রাখি।
বৈঠকে তারা ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠাতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক আবদুল জলিল, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য অধ্যক্ষ মাহবুবুর রহমান, নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা আবদুল মাজেদ আতহারী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার আনোয়ার হোসেন।
আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা ইউসুফ আশরাফ, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহার ও লেবার পার্টির মহাসচিব খন্দকার মিরাজুল ইসলাম।