ওয়েব ডেস্ক: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে চোরতন্ত্র ব্যাকফুটে রয়ে গেছে, এটির পতন করা সম্ভব হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যে দায়িত্ব ছিল, সেটি পালনে তারা অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে। যে সংস্কারগুলোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়নে অনেক ক্ষেত্রেই ধীর গতি দেখা গেছে। গণঅভ্যূত্থান পরবর্তী সময়ে শ্রীলঙ্কা বিশ্বজুড়ে দুর্নীতির ধারণাসূচকে (সিপিআই) ৩ পয়েন্ট উন্নতি করতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশ সেখানে ব্যর্থ হয়েছে। স্কোরের দিক দিয়ে আমরা যে ১ পয়েন্ট উন্নতি করেছি সেটি দুর্নীতি কমার কারণে নয়, বরং জুলাই আন্দোলনের ফল। কেননা, আন্দোলনটি চোরতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছিল। তাই, সেটির মূল্যায়নে সিপিআই স্কোর ১ পয়েন্ট বেড়ে ২৪ হয়েছে।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির নিজস্ব কার্যালয়ে বার্লিনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) সিপিআই ২০২৫-এর প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থানকালে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় টিআইবির নির্বাহী ব্যবস্থাপনা পর্ষদের পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের, বহির্বিভাগ এবং যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম ও গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ বদিউজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমরা চোরতন্ত্রের জন্য দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমাদের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের জন্য বিশ্বের অনেক দেশে উন্নতি হয়। এতে সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো এগিয়ে যায়। আমরা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যে দলবাজি-দখলদারি দেখেছি, তাতে স্পষ্ট যে দুর্নীতির হাতবদল হয়েছে মাত্র, দমন হয়নি।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান দুটি দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্র সংস্কার ও দুর্নীতি প্রতিহত করা। দুটি ক্ষেত্রেই তারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। তারা তাদের নিজেদের পছন্দে জোর দিয়েছেন, অন্য কারো মতামতে মূল্যায়ন করেনি।
রাজনৈতিক ও আমলাতন্ত্রের কারণে সংস্কারে বাধাগ্রস্ত হয়েছে জানিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, রাজনৈতিক ও আমলাতন্ত্রের অপশক্তির কারণে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্বচ্ছতার চর্চা করতে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে দুর্নীতিমুক্ত হওয়া সম্ভব কীনা, সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর আগামী নির্বাচনে যে ইশতেহার ঘোষণা করেছে, তাদের সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলেই দুর্নীতি প্রতিহত করা সম্ভব। স্বার্থের দ্বন্দ্বে- রাষ্ট্রের স্বার্থ ও নিজের স্বার্থ আলাদা করতে না পারলে রাষ্ট্রের উন্নয়ন সম্ভব নয়। নিজের স্বার্থের আগে রাষ্ট্রের স্বার্থে গুরুত্ব দিতে হবে। ক্ষমতায় আসুক বা না আসুক, প্রত্যেক রাজনৈতিক দলগুলোকে দুর্নীতি দমনে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের যেসব দেশগুলো সিপিআই স্কোরে ১০০ পয়েন্টের কাছাকাছি অবস্থান করছে, সেসব দেশগুলোতে দুর্নীতি করলে শাস্তি নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে। আমাদের দেশেও এটি নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক আশ্রয়ে দুর্নীতিগ্রস্তরা যেন দায়মুক্তি না পায়, সেজন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। দুদকের পাশাপাশি সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতি দমনে কাজ করতে হবে। রাষ্ট্রীয় সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দুর্নীতি কমিয়ে আনা সম্ভব।
সংস্থার এই নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এজন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বাড়াতে হবে। যে দেশগুলোতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যত বেশি, সেই দেশগুলোতে তত দ্রুত দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
টিআইবি এমন সময় ২০২৫ সালের সিপিআই সূচক প্রকাশ করেছে যখন দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যে একদিন পরই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১৯৯৫ সাল থেকে বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল প্রতি বছর এই সূচক প্রকাশ করে। ২০০১ সালে বাংলাদেশ প্রথম তালিকাভুক্ত হয়। তখন এ তালিকায় মোট ৯১টি দেশ ঠাঁই পায়।
২০২৫ সালের সিপিআই সূচক অনুযায়ী, বিশ্বের ১৮২টি দেশের মধ্যে ‘সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত’ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম। ২০২৪ সালে এই অবস্থান ছিল ১৪তম। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে দুর্নীতিতে একধান অবনতি হয়েছে বাংলাদেশের। আলোচিত বছরে সিপিআই স্কোর ২৩ পয়েন্ট থেকে বেড়ে ২৪ পয়েন্টে উন্নিত হয়েছ। তবে টিআইবি বলছে, এটি কেবলই জুলাই আন্দোলনের ফল। বাস্তবে আরো দুর্নীতিগ্রস্ত হয়েছে দেশ।
সিপিআই সূচকে এবছর কোন দেশই শতভাগ স্কোর পায়নি। ১০০ স্কোরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্কোর পেয়েছে ডেনমার্ক, যা ৮৯ পয়েন্ট। কম দুর্নীতিগ্রস্ত ১০টি দেশের তালিকায় ৮৪ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ফিনল্যান্ড এবং ৮৪ স্কোর নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে সিঙ্গাপুর।
অন্যদিকে, ১০০ স্কোরের মধ্যে মাত্র ৯ পয়েন্ট নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে যৌভভাবে দুই দেশ- সুদান ও সোমালিয়া। বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভেনেজুয়েলা এবং তৃতীয় হয়েছে যৌথভাবে ইয়েমেন, লিবিয়া ও ইরিত্রিয়া।