সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:৩১ পূর্বাহ্ন
ওয়েব ডেস্ক: শেখ হাসিনার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা এবং বিডিআরসহ অন্যান্য বাহিনীগুলোকে দুর্বল করাই বিডিআর হত্যাকাণ্ডের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান।
রোববার সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা শেষে কমিশনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান তিনি।
তিনি বলেন, আজ সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। ১১ মাস পর এই প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। সেখানে আমরা ২৪৭ জনের সাক্ষ্য নিয়েছি। এদের মধ্যে শহীদ পরিবারের সদস্যদের জবানবন্দি ১৪ জন, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ১০ জন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা দুজন, সামরিক কর্মকর্তা ১৩০ জন, অসামরিক কর্মকর্তা চারজন, পুলিশ কর্মকর্তা ২২ জন, বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ ৯ জন, সাবেক ও বর্তমান বিডিআর বা বিজিবি সদস্য ২২ জন, কারাগারে আছেন ২৬ জন ও সাংবাদিক তিনজন। এর মধ্যে আমরা ৬০০ ঘণ্টা ভিডিও সাক্ষাৎকার ও রেকর্ডিং রিভিউ করেছি। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত স্থিরচিত্র ও ছবি নিয়েছি প্রায় ৮০০টি। বিভিন্ন খবরের কাগজে প্রচারিত সংবাদ নিয়েছি প্রায় ২১৫টি, সরকারি ও বেসরকারি মোট ২৭টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পত্রালাপ করা হয়েছে। পত্রালাপের মাধ্যমে ৯০৫টি এবং প্রতিমাসে ৮১টি চিঠি দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত ছয়টি তদন্ত প্রতিবেদন সেনাবহিনীকে ফেরত দেওয়া হয়েছে। জাতীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ফেরত দেওয়া হয়েছে। তৎকালীন বিডিআর পরিচালিত ৫২টি তদন্ত প্রতিবেদন বিজিবিতে ফেরত দেওয়া হয়েছে। ওয়েবসাইট বা ই-মেইল বা জবানবন্দি ভিডিও ক্লিপের মাধ্যমে ৩১৬টি বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।
এসব হত্যাকাণ্ডের মূল মাস্টারমাইন্ড কারা ছিল— এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, শেখ সেলিম, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজম, সাহারা খাতুন, নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল তারেক সিদ্দিকী, তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ, তৎকালীন ডিজিএফআই-এর প্রধান মেজর জেনারেল আকবর।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওই সময় সরকার তার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চেয়েছিল এবং বিডিআরসহ বাহিনীগুলোকে দুর্বল করতে চেয়েছিল।
এই ষড়যন্ত্র কতদিন ধরে চলছিল এবং পেছনে কারা জড়িত ছিল— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে তারা এই ষড়যন্ত্র করে আসছিল। এই বিডিআর হত্যাকাণ্ডে পার্শ্ববর্তী একটি দেশ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল। প্রতিবেশী দেশ বলতে আমরা ভারতকে বুঝিয়েছি।
সেনা অভিযান কেন করা হয়নি— সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মঈনের কারণে সেনা অভিযান হয়নি। জেনারেল মঈন বলেছিলেন, সেনা অভিযানে গেলে ভারত এখানে হস্তক্ষেপ করত। আমি যদি এখানে অভিযান চালানো শুরু করতাম, তাহলে ভারত এখানে ইন্টারফেয়ার করত এবং ভারত ১৯৭১ সালের মতো বাংলাদেশ থেকে তারা আর ফিরে যেত না। দুই দিনে যখন ৫৭ অফিসার নিহত হয়, তখন দেশে আর স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব থাকে না।
বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর পাঁচজন সেনাবাহিনী কর্মকর্তাকে কি গুম করা হয়েছিল— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিজিএফআই-এর হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল।
ডাল-ভাত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে কিনা— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডাল-ভাত কর্মসূচিকে তারা সামনে এনেছিল, কিন্তু এর পেছনে ছিল বড় ধরনের ষড়যন্ত্র। বাহিনীগুলোকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা ও শেখ হাসিনার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য এই ঘটনা ঘটিয়েছে।
জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের সভাপতি জানান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল থেকে জেনারেল আজিজ আহমেদের চলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তাকে প্রোমোশন দিয়ে ডিজি বিজিবি করা হয়।
বিডিআর বিদ্রোহে শুধু বিডিআর সদস্য নাকি বাইরের কেউ ছিল— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিডিআর সদস্য ছাড়াও বহিরাগতরা ছিল। আমরা তদন্তে পেয়েছি, সেই সময়ে ৯২১ জন ভারতীয় বাংলাদেশে এসেছিল, তাদের মধ্যে ৬৭ জন লোকের হিসাব মিলছে না। তারা কীভাবে বের হয়েছে, সেটা পাওয়া যাচ্ছে না। এ ৬৭ জনকে খুঁজে বের করার জন্য সরকারকে আমরা সুপারিশ করেছি। ভারত যে এই ঘটনায় জড়িত, সেটা সরকারকে বলেছি ভারতের কাছে জবাব চাইতে।
বিডিআর বিদ্রোহে গোয়েন্দা ব্যর্থতা পাওয়া গেছে কি না— জানতে চাইলে তিনি বলেন, গোয়েন্দা ব্যর্থতার প্রমাণ ছিল। কীভাবে গোয়েন্দা কার্যক্রম শক্তিশালী করা যায়, এটার বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছি। আমরা নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পরামর্শ দিয়েছি। বিভিন্নভাবে সে বিষয়গুলো তুলে ধরেছি।
ঘটনার সময় পিলখানায় হত্যাকারীদের অনেকে হিন্দি ভাষায় কথা বলছিল, এমন বক্তব্য বিভিন্ন সময়ে ভিডিওতে স্বজনরা দিয়েছেন, এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে কিনা— জানতে চাইলে তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমরা এমন তথ্য পেয়েছি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্তে একাধিক সাক্ষ্যে দেখা যায়— বিদ্রোহে শুধু বিডিআর সদস্য নয়, বাইরে থেকেও মানুষ অংশ নেয়। এদের মধ্যে অনেকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সদস্য ছিল বলেও সাক্ষ্যে উঠে এসেছে। ২০-২৫ জনের দল বিদ্রোহস্থলে ঢুকে পড়ে ২০০ জনের একটি মিছিলে বের হয়ে যায়।