স্পোর্টস ডেস্ক: আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেওয়ার পর পাকিস্তান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশের আসন্ন বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ ২০২৪ সালের জুনে নিশ্চিত হয়েছিল। ভারত থেকে তাদের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরানোর দাবি নিয়ে আইসিসির সঙ্গে কয়েক সপ্তাহের অচলাবস্থার পর শনিবার তারা বাদ পড়ে। আইসিসি বাংলাদেশের পরিবর্তে পরবর্তী সেরা র্যাংকিংধারী দল স্কটল্যান্ডকে সুযোগ দিয়েছে।
একটি পূর্ণ সদস্য দেশকে লজিস্টিক্যাল ইস্যুর কারণে বের করে দেওয়ার এই নজিরবিহীন পদক্ষেপে আইসিসির বিরুদ্ধে ‘দ্বিমুখী নীতি’ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে।
পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড দ্রুত বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছে এবং বলেছে যে আগামী সপ্তাহের আগে তারা তাদের দলের অংশগ্রহণের বিষয়ে কোনো ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত’ নেবে না।
পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নকভি সোমবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা করতে বৈঠক করেন, তবে ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া টুর্নামেন্টে পাকিস্তান যাবে কি না তা স্পষ্ট করেননি।
‘সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি শুক্রবার অথবা আগামী সোমবার নেওয়া হবে।’, নকভি এক্স-এ একটি পোস্টে এ কথা জানান।
নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদের মধ্যকার বৈরি সম্পর্কের কারণে পাকিস্তানের বিশ্বকাপের সব ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় নির্ধারিত হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বিতর্কটি আসলে কী নিয়ে?
তিনটি দক্ষিণ এশীয় দেশের এই বিতর্ক শুরু হয় তিন সপ্তাহ আগে যখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড অনুরোধ করেছিল যেন ভারত থেকে তাদের বিশ্বকাপ ম্যাচগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়। তারা খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছিল।
ঘটনার সূত্রপাত, ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের নির্দেশে বাংলাদেশি ফাস্ট বোলার মুস্তাফিজুর রহমানকে তার আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্সের স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়ার পর।
বিসিসিআই এর কারণ হিসেবে ‘পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি’র কথা বলেছিল। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যান ২০২৪ সালের আগস্টে, তারপর থেকে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে সম্পর্কের অবনতির দিকে ইঙ্গিত করে এই পদক্ষেপ।
বাংলাদেশের যুক্তি ছিল, যদি তাদের একজন খেলোয়াড় ভারতে নিরাপদ না হন, তবে তারা পুরো স্কোয়াড এবং সাপোর্ট স্টাফদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে না।
যাইহোক, জয় শাহর নেতৃত্বাধীন আইসিসি বাংলাদেশের ম্যাচ সরানোর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে। গভর্নিং বডি জানায় যে বাংলাদেশি দলের জন্য কোনো ‘বিশ্বাসযোগ্য’ বা ‘যাচাইযোগ্য’ হুমকি নেই।
বিসিবি ও আইসিসির মধ্যে দীর্ঘ বাদানুবাদের পর যেখানে কোনো পক্ষই তাদের অবস্থান থেকে সরেনি— ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং স্কটল্যান্ড তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়।
কেন আইসিসির বিরুদ্ধে ‘ভণ্ডামির’ অভিযোগ উঠেছে?
২০২৪ সালের শেষ দিকে আইসিসি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি তিন বছরের চুক্তি করিয়েছিল, যা দুই দেশকে তাদের প্রতিবেশী দেশে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজিত হলে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে ম্যাচ খেলার সুযোগ দেয়।
এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যখন ভারত নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ দেখিয়ে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির জন্য পাকিস্তানে যেতে অস্বীকার করে। ভারত তাদের ফাইনালসহ সব ম্যাচ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে খেলেছিল।
২০২৫ সালে ভারত ও শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত আইসিসি নারী বিশ্বকাপে পাকিস্তান তাদের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় খেলছে এবং ২০২৬ সালের পুরুষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও একই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল এই চুক্তির দিকে আঙুল তুলেছেন এবং বাংলাদেশের একই ধরনের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করার জন্য আইসিসিকে ‘ভণ্ডামির’ দায়ে অভিযুক্ত করেছেন।
যখন বিসিবি ও আইসিসি অচলাবস্থায় ছিল, তখন পিসিবি বাংলাদেশের নিরপেক্ষ ভেন্যুর দাবি সমর্থন করে এই বিতর্কে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
গত সপ্তাহে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য ডাকা আইসিসি বোর্ড সভায় পাকিস্তানই ছিল একমাত্র পূর্ণ সদস্য দেশ, যারা বাংলাদেশের অবস্থানকে সমর্থন করেছিল।
পাকিস্তান কেন এই বিষয়ে জড়িয়ে পড়ল?
যদিও বিতর্কটি খেলাধুলা নিয়ে, তবে এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক উত্তেজনা ও এই তিন দেশের কয়েক দশকের ভঙ্গুর সম্পর্ক।
২০২৪ সালের প্রেক্ষাপটে— হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির সাথে সাথে ভারত ও বাংলাদেশের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে ফাটল ধরেছে, অন্যদিকে অতীতে তলানিতে থাকা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক দ্রুত উন্নত হচ্ছে।
তাই বাংলাদেশ যখন আইসিসির সাথে আলোচনায় আটকা পড়েছিল, পাকিস্তানের ক্রিকেট প্রধান নকভি প্রকাশ্যেই গভর্নিং বডির সমালোচনা করেছিলেন, ‘আপনারা দ্বিমুখী নীতি রাখতে পারেন না। আপনারা একটি দেশের (ভারত) ক্ষেত্রে বলতে পারেন না যে তারা যা খুশি করতে পারবে এবং অন্যদের ক্ষেত্রে তার সম্পূর্ণ বিপরীত করতে হবে। এই কারণেই আমরা এই অবস্থান নিয়েছি এবং স্পষ্ট করেছি যে বাংলাদেশের প্রতি অবিচার করা হয়েছে। তাদের বিশ্বকাপে খেলা উচিত। তারা ক্রিকেটের একটি বড় স্টেকহোল্ডার।’
পাকিস্তান কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে?
বিসিসিআই মুস্তাফিজুরকে আইপিএল থেকে সরানোর কয়েক দিনের মধ্যেই পিসিবি প্রতিক্রিয়া জানায় এবং এই বাংলাদেশি তারকা বোলারকে পাকিস্তান সুপার লিগে নিবন্ধনের প্রস্তাব দেয়।
পাকিস্তানি গণমাধ্যমে পিসিবির টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহারের খবর থাকলেও নকভি সরাসরি তেমন কোনো ইঙ্গিত দেননি।
এমন জল্পনাও রয়েছে যে বাংলাদেশের প্রতি সংহতি প্রকাশে প্রতীকী হিসেবে পাকিস্তান ১৫ ফেব্রুয়ারি কলম্বোতে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি বর্জন করতে পারে।
শুক্রবার বা সোমবারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা এই অনিশ্চয়তা পাকিস্তানের টুর্নামেন্ট প্রস্তুতিকে বিঘ্নিত করতে পারে। ৭ ফেব্রুয়ারি নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচ খেলার কথা রয়েছে তাদের।
আইসিসি এবং পিসিবির সাবেক চেয়ারম্যান এহসান মনি পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ থেকে সরে না আসার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘এটি খেলায় রাজনীতি নিয়ে আসে, এবং আমি সব সময় এই দুটিকে আলাদা রাখার পক্ষপাতী।’
পাকিস্তান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহার করলে কী হবে?
রাজনৈতিক অঙ্গনে পাকিস্তান ও ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দীর্ঘকাল ধরেই ক্রিকেট মাঠে গড়িয়েছে। লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সের অধ্যাপক আলী খান পাকিস্তানের বাংলাদেশের প্রতি সমর্থনকে ‘নীতিগত অবস্থান’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তবে তিনি সতর্ক করেছেন যে বয়কটের হুমকি দেওয়াটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। তিনি বিশ্বাস করেন, শক্তিশালী কূটনীতির মাধ্যমে আইসিসির এই বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদ করা উচিত।
অন্যদিকে, প্রবীণ ভারতীয় ক্রিকেট লেখক শারদা উগ্র মনে করেন, পাকিস্তানের এই হস্তক্ষেপ একটি জোট তৈরির লক্ষ্য হতে পারে। তিনি বলেন, পাকিস্তান সরে দাঁড়ালে ক্রিকেট ভক্তরা হতাশ হবে এবং এর ফলাফল সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
এই বিতর্ক ক্রিকেটে কী প্রভাব ফেলবে?
অধ্যাপক আলী খান যুক্তি দেখান যে, ক্রিকেটে ভারতের বিশাল আর্থিক প্রভাব আইসিসিকে এতটাই ভারসাম্যহীন করে তুলেছে যে এটি অনেকটা ভারত সরকারের মুখপাত্রে পরিণত হয়েছে।
শারদা উগ্র এই বিষয়ে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ডের নীরবতারও সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের মতো একটি পূর্ণ সদস্য দেশের প্রতি আইসিসির আচরণকে আরও ন্যায়সংগত করার ক্ষেত্রে এই বোর্ডগুলোর ভূমিকা রাখা উচিত ছিল।